Sunday, December 22, 2019

দেশে প্রথম হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক, মানবিকতার আড়ালে অমানবিকতার সূচনাঃ নয়ন চ্যাটার্জি


সম্প্রতি ঢাকার শিশু-মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটটি (ICMH) 'হিউমেন মিল্কব্যাংক' চালু করেছে। অনেকেই বিষয়টিকে মানবিকতার দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এ বিষয়টির মাধ্যমে একটি ভয়ঙ্কর অমানবিকতা চালু হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

১) এই 'হিউমেন মিল্কব্যাংক' চালুর সময় স্পষ্ট বলা হয়েছে- কোন মা যদি দুগ্ধ দান করেন, তবে তাকে অর্থ দেয়া হবে না। আবার যারা দুগ্ধ সংগ্রহ করবে তাদের থেকেও কোন প্রকার অর্থ সংগ্রহ করা হবে না।

২) এই ব্যাংকে মায়েরা তাদের অতিরিক্ত দুগ্ধ দান করে যাবেন, যা সংরক্ষণ করা হবে। কোন বাচ্চা চাইলে তাকে দেয়া হবে।

৩) ব্লাড ডোনেশনের সাথে মিল্ক ডোনেশনের একটা পার্থক্য আছে। মানুষের ব্লাড নেয়ার একটা মাত্রা আছে। কারো এক ব্যাগ, কারো দুই ব্যাগ। কিন্তু একটা বাচ্চার কতটুকু দুধ লাগতে পারে, তার কোন নির্দ্দিষ্ট সীমা নাই। এখানে একবার খেলেই প্রয়োজন শেষ এমন নয়, ক্ষেত্রবিশেষে শত শত লিটারও লাগতে পারে। এক্ষেত্রে দুধমাতা এবং শিশুর মাঝখানে ব্যয়বহুল ব্যাংকএর অস্তিত্ব তৈরী না করে দুধমাতা এবং শিশুকে মিলিয়ে দিলে সবচেয়ে ভালো, কারন ইহা অতিরিক্ত খরচমুক্ত এবং সম্পূর্ণ ঝূকিমুক্ত।

৪) ব্লাড ডোনেশনের কথা বলা হলেও ইচ্ছা অনিচ্ছায় ব্লাড কিন্তু ক্রয় অথবা বিক্রয় হচ্ছে। তেমনি মায়ের দূধের বেলায় ও প্রথমে ফ্রি করার কথা বলা হলেও পরবর্তীতে তার মধ্যে যদি আর্থিক লাভ খোজার চেষ্টার করা হয়, তখন কিন্তু ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটবে। প্রথমত যেটা ঘটবে একজন মা তার শিশুকে বঞ্চিত করে দুধ বিক্রি করার চেষ্ট করবে। এক্ষেত্রে প্রতি লিটার দুধ কয়েক হাজার টাকা দরে বিক্রি হবে। এতে অনেক মা কর্মাশিয়াল দিকে চলে গেলে অনেক শিশু ২ বছর পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধ না পেয়ে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার শিশুদের জন্য দুধ বলা হলেও বয়স্ক শ্রেণীর কিছু মানুষ এক বিশেষ চাহিদায় এই দুধ পান করে থাকে। ফলে তারা উচ্চমূল্য দিয়ে সেই দুধ ক্রয় করতে থাকবে। প্রথমে শিশুদের জন্য মিল্ক ব্যাংক বলা হলেও পরে পশ্চিমের দেশগুলোর মতো এখানেও কিন্তু কর্মাশিয়ালভাবে মানব দুগ্ধ কেনাবেচা শুরু হবে। যা চরম অমানবিক একটি বিষয় হবে। আর একবার শুরু হলে বিষয়টি কন্ট্রোল করাও সম্ভব হবেনা।

৫) অনেকের হয়ত বাচ্চা মারা গেছে বা কোন কারণে দুধ খেতে পারে না, তারা এই দুধ ডোনেশন করবে, এই ধারণা যারা করছেন, তাদের জন্য বলছি, মাতৃদুগ্ধ কিন্তু এমনি এমনি উৎপন্ন হয় না। এই দুধ উৎপন্ন হওয়ার জন্য একটি শর্ত আছে। শর্তটি হলো শিশুটিকে মাতৃস্তন চোষণ করতে হয়, চোষণ করলে মায়ের মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি উদ্দিপ্ত হয়ে প্রলেকটিন হরমোন তৈরী করবে। প্রকেলটিক হরমোনকে মিল্ক হরমোনও বলা হয়। শিশু যদি চোষণ না করে তবে এই হরমোন উৎপন্ন হবে না, ফলে মাতৃদুগ্ধ উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং কারো যদি নিজ সন্তান কোন কারণে দুধ না খায়, তবে তার দুধ উৎপাদন ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যাবে। তাই তার পক্ষে ডোনেশন করাও সম্ভব না। হ্যাঁ সে যদি কোন শিশুর সরাসরি দুধ মা হয়ে ডাইরেক্ট শিশুকে দুধ খাওয়ায় তখন তার দুধ উৎপাদন ক্ষমতা জারি থাকবে।

৬) ফিডারে দুধ খাওয়ানো ছোট্ট শিশুর জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে এবং স্বাস্থ্য ঝুকি থাকবেই, যেটা যে কোনই দুধ হোক না কেন (পেট ফাপা, শ্বাসনালীতে আটকে যাওয়া, কানপাকা)। এক্ষত্রে দুধমাতার থেকে যদি ডাইরেক্ট শিশু খাদ্য গ্রহণ করে তবে কোন সমস্যাই হয় না। তাই স্বাস্থ্যঝুকির কথা চিন্তা করে মাঝখানের জমা রাখার সিস্টেমকে এভয়েড করা সবচেয়ে ভালো।

৭) আমি হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকএর বিরোধী নই। কিন্তু এখন যে সিস্টেম হয়েছে, এর বিরোধী। মানে মাঝখানে দুধ জমা রাখার সিস্টেমের। মিল্ক ব্যাংক এর বদলে দুদ মা ব্যাংক করুক সমস্যা নাই (দুধ মা ব্যাংক হলো একজন মা তার দুধ ডোনেশন করলে তার ইনফরমেশন সেই ব্যাংকে জমা থাকবে এবং যার দরকার লাগবে সরাসরি সেই মহিলার নিকট যার প্রয়োজন সে যোগাযগ করবে বা ব্যাংক করিয়ে দেবে)। কারণ এটা একটা ব্যয়বহুল পদ্ধতি। এখন একটা এনজিও ফান্ডিং করতেছে, তাই করা গেছে, কিন্তু কিছুদিন পর ফান্ডিং বন্ধ করে দিলে সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে। তখন কি হবে? জনগণের চাল-ডালের দাম বাড়িয়ে সেই কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে এই সেকশন চালাতে হবে। পরবর্তীতে সেখানে তৈরী হবে দুর্নীতি বড় আখড়া, দুর্নীতি বাড়তে থাকলে ভালো মানের দুধ পাওয়া নিয়ে হবে সন্দেহ। কিন্তু এতকিছু ঝামেলা ও অতিরিক্ত কোন খরচ ছাড়াই এ ধরনের সিস্টেম চালানো চায়। আপনি শুধু এক হাসপাতালে নয়, বরং প্রতি থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটা তালিকা তৈরী করুন, কোন কোন মা দুধমাতা হতে রাজী। কোন বাচ্চার যদি মাতৃদুধ প্রয়োজন হয়, শুধু তাদের দুইজনের (বাচ্চার পরিবার ও দুধমাতা) মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে দিন। তারাই নিজেদের মধ্যে পছন্দ করে নিবে এবং প্রয়োজনে দরদাম করে নিবে। এতে গরীব মায়েরা উপকৃত হবে। থানা ভিত্তিক লিস্ট হলে এবং ফোনের যুগ হওয়াতে দুধমাতা আসতে ১ ঘণ্টার বেশি লাগবে না। নিজের বাচ্চা ছাড়া অন্য বাচ্চা যখন মাতৃস্তন চোষণ করবে তখন অতিরিক্ত প্রলেকটিন হরমোন নিঃসৃত হবে, ফলে অতিরিক্ত দুগ্ধ উৎপন্ন হবে, তাই ঐ মায়ের নিজের শিশুও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এখনে লাভ ক্ষতির হিসেব না রাখলে শুধু এনজিওর টাকা বা ভর্তুকি দিয়ে এটা বেশি দিন টিকবে না, সিস্টেমটাও বড় হবে না। আর তাছাড়া মায়েরা ফ্রি দুগ্ধ ডোনেট করে যাবে, বিষয়টি যতটা সহজ ভাবছেন, তত সহজ না। বিশেষ করে বাংলাদেশের মত আর্থসামাজিক অবস্থার দেশে। মায়ের শরীরে দুধ আসতেও খরচ হয়। সেই খরচ করা জিনিস কয়জন মা সময় খরচ করে ফ্রি দিয়ে যাবে সেই বাস্তব চিন্তাও মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু এবিষয়গুলো মাথায় না রাখলে মিল্ক ব্যাংক পরবর্তীতে হয় বন্ধ হয়ে যাবে, নয়ত প্রয়োজন অনুসারে কর্মাশিয়াল সিস্টেমে ডায়ভার্ট হলে ৪ নম্বর পদ্ধতি অনুসারে এটা উল্টো মানবিকের বদলে অমানবিক হয়ে যাবে।

আসলে এইসব মিল্ক ব্যাংক ইউরোপ-আমেরিকার মত ঋণাত্মক জন্মহারের রাষ্ট্র এবং পরিবার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন এবং গে ফ্যামিলিগুলোর জন্য দরকারী হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মত জনবহুল রাষ্ট্র এবং শক্ত পারিবারিক সম্পর্কযুক্ত রাষ্ট্রের জন্য অত বেশি দরকারী নয়। তবুও যেহেতু চালু হয়েছে, এখন যে সিস্টেম আছে, এটা পরিবর্তন করে ৭ নম্বর নিয়ম অনুসারে করলে সবাই তা থেকে সুবিধা নিতে পারবে এবং উপকৃত হবে। এছাড়া বর্তমান নিয়মে চললে সুবিধার থেকে অসুবিধাই বেশি তৈরী হবে যা এদেশের ৯৫% মুসলমানদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকেও হারাম বলে অনেক ইসলামবেত্তা অলরেডি ফতোয়া দিয়েছেন।


শেয়ার করুন

0 facebook: